মণিপুরের বর্তমান অশান্তি বা জাতিগত দাঙ্গার নেপথ্যে কয়েক দশকের পুরনো এবং অত্যন্ত জটিল কিছু কারণ রয়েছে।

 মণিপুরের বর্তমান অশান্তি বা জাতিগত দাঙ্গার নেপথ্যে কয়েক দশকের পুরনো এবং অত্যন্ত জটিল কিছু কারণ রয়েছে।


 

মূলত **মেইতেই (Meitei)** এবং **কুকি (Kuki)** সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ২০২৩ সালের মে মাসে এক ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়।

এর প্রধান কারণগুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:

### ১. এসটি (ST) মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয় যে, **মেইতেই** সম্প্রদায়কে 'তফসিলি উপজাতি' বা Scheduled Tribe (ST) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে।

 * **মেইতেইদের দাবি:** তারা মনে করে এসটি মর্যাদা পেলে তাদের সংস্কৃতি রক্ষা পাবে এবং তারা পাহাড়ি অঞ্চলে জমি কেনার অধিকার পাবে।

 * **কুকি ও নাগাদের প্রতিবাদ:** পাহাড়ি উপজাতিরা ভয় পায় যে মেইতেইরা (যারা সংখ্যায় বেশি এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী) যদি এসটি হয়ে যায়, তবে উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত চাকরি এবং জমির অধিকার মেইতেইরা দখল করে নেবে।

### ২. জমির অধিকার ও সংরক্ষিত বন

রাজ্য সরকার পাহাড়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চল (Reserved Forests) থেকে 'অবৈধ দখলদার' হঠানোর অভিযান শুরু করেছিল। কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ মনে করে, এটি আসলে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার একটি ষড়যন্ত্র। এই ভূমি সমস্যা নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়।

### ৩. মায়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ

মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেখান থেকে বহু মানুষ (বিশেষ করে কুকি-চিন সম্প্রদায়ের) মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। মেইতেইদের অভিযোগ, এই অনুপ্রবেশের ফলে রাজ্যের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বনের জমিতে পপি (Afim) চাষ বাড়ছে।

### ৪. মাদক বিরোধী অভিযান

সরকার 'War on Drugs' বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পাহাড়ি অঞ্চলে পপি চাষ ধ্বংস করতে শুরু করে। কুকি সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ পাহাড়ে চাষবাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা এই পদক্ষেপকে তাদের জীবনজীবিকার ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছে।

### সংক্ষেপে বর্তমান পরিস্থিতি:

৩ মে, ২০২৩ তারিখে একটি প্রতিবাদ মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রথম সহিংসতা শুরু হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে:

 * রাজ্যটি কার্যত দুটি ভৌগোলিক অংশে ভাগ হয়ে গেছে (উপত্যকায় মেইতেই এবং পাহাড়ে কুকিরা)।

 * শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

 * উভয় পক্ষই অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করায় এটি একটি 'গৃহযুদ্ধ'-এর মতো রূপ ধারণ করেছে।

সহজ কথায়, এটি কেবল একটি দাঙ্গা নয়; এটি **জমি, ক্ষমতা এবং নিজের পরিচয় রক্ষার** এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াই।

Comments